মহালয়ার ভোর। রেডিও চালিয়ে চমকে উঠলেন শ্রোতারা। চেনা কণ্ঠটি কোথায়? বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের বদলে শোনা যাচ্ছে উত্তমকুমারকে। গানেও তারকার মেলা—লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোসলে, মান্না দে। সংগীত পরিচালনায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। এত আয়োজন, তবু শ্রোতাদের মন ভরল না। বেতার কেন্দ্রে আসতে লাগল ক্ষুব্ধ টেলিফোন, আপত্তির চিঠি। মহানায়কের কণ্ঠেও তাঁরা ফিরে পেলেন না তাঁদের চেনা মহালয়ার ভোর। সালটা ১৯৭৬। দীর্ঘদিনের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ সরিয়ে আকাশবাণী প্রচার করেছিল ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম্’। নতুন আয়োজনের বড় আকর্ষণ ছিলেন সে সময়ের জনপ্রিয় তারকারা। কিন্তু যে কণ্ঠ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পুজোর আগমনী শুনিয়েছে, তার জায়গা নেওয়া কি এত সহজ? সেই সিদ্ধান্ত, শ্রোতাদের ক্ষোভ আর শিল্পীদের অস্বস্তিকর অবস্থান নিয়েই সৌমিক সেনের সিনেমা ‘মহালয়া’। ছবির ঘটনাপ্রবাহ পরিচিত। পরিণতিও অনেকের জানা। তবু দেখার আগ্রহ থাকে। কারণ, এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির শারদীয় স্মৃতি। শরতের হিম হিম ভোর, জানালার বাইরে অন্ধকার, ঘুমজড়ানো চোখ আর রেডিও থেকে ভেসে আসা সেই উচ্চারণ—‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর…’ । পশ্চিমবঙ্গের বহু পরিবারে মহালয়ার সকাল শুরু হয় এই অনুষ্ঠান শুনে। দুর্গাপূজার আবহের সঙ্গে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ এমনভাবে মিশে গেছে যে অনুষ্ঠানটি বদলানো মানে যেন পরিচিত ভোরটিকেই বদলে দেওয়া ।এই আবেগ এক দিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের ইতিহাস।১৯৩০ সালে ভারতীয় বেতার পরিচালনার দায়িত্ব নেয় সরকার। তখনো জাতীয় বেতারের জন্য ‘আকাশবাণী’ নামটি গ্রহণ করা হয়নি । নামটি গৃহীত হয় ১৯৫৬ সালে। সে সময় সংগীতনির্ভর বেতার অনুষ্ঠান নিয়ে শ্রোতাদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে।১৯৩২ সালে মার্কণ্ডেয় চণ্ডী অবলম্বনে ‘বসন্তেশ্বরী’ নামে একটি গদ্য-পদ্যময় কাব্য রচনা করেন বাণীকুমার। তাঁর পুরো নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। রচনাটি বেতারে সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত হয়। এতে সুর সংযোজন করেন পণ্ডিত হরিশ্চন্দ্র বালী ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। কথামালা ও চণ্ডীর শ্লোকপাঠে যুক্ত ছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ও বাণীকুমার। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন রাইচাঁদ বড়াল।ওই বছরই মহিষাসুর বধের ঘটনা অবলম্বনে আরেকটি গীতিআলেখ্য রচনা করেন বাণীকুমার। সুর, সংগীত ও শ্লোকপাঠের সমন্বয়ে তৈরি অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয় ‘বিশেষ প্রত্যুষ অনুষ্ঠান’ নামে।…
Leave a Reply